বিসর্জন – ১
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
মন্দির
গুণবতী
রঘুপতির প্রবেশ
প্রভু,
চিরদিন মা’র পূজা করি। জেনে শুনে
কিছু তো করি নি দোষ। পুণ্যের শরীর
মোর স্বামী মহাদেবসম–তবে কোন্
দোষ দেখে আমারে করিল মহামায়া
নিঃসন্তানশ্মশানচারিণী?
[ উভয়ের প্রস্থান
গোবিন্দমাণিক্য অপর্ণা ও জয়সিংহের প্রবেশ
প্রতিমার প্রতি
জয়সিংহের প্রতি
প্রতিমার প্রতি
জনান্তিক হইতে
[ প্রস্থান
[ জয়সিংহ ও অপর্ণার প্রস্থান
দ্বিতীয় দৃশ্য
রাজসভা
রাজা রঘুপতি ও নক্ষত্ররায়ের প্রবেশ
সভাসদ্গণ উঠিয়া
ছুটিয়া আসিয়া
[ প্রস্থান
রাজার নিরুত্তরে চিন্তা
রাজার চিন্তা
সনিশ্বাসে
[ প্রস্থান
তৃতীয় দৃশ্য
মন্দির
জয়সিংহ
নেপথ্যে গান
তাহারো কাঙাল তুমি। যে তোমার সব
নিতে পারে, তারে তুমি খুঁজিতেছ যেন।
ভ্রমিতেছ দীনদুঃখী সকলের দ্বারে।
এতদিন ভিক্ষা মেগে ফিরিতেছি–কত
লোক দেখি, কত মুখপানে চাই, লোকে
ভাবে শুধু বুঝি ভিক্ষাতরে–দূর হতে
দেয় তাই মুষ্টিভিক্ষা ক্ষুদ্র দয়াভরে।
এত দয়া পাই নে কোথাও–যাহা পেয়ে
আপনার দৈন্য আর মনে নাহি পড়ে।
[ প্রস্থান
রঘুপতির প্রবেশ
পা ধুইবার জল প্রভৃতি অগ্রসর করিয়া
চতুর্থ দৃশ্য
অন্তঃপুর
গুণবতী ও পরিচারিকা
[ পরিচারিকার প্রস্থান
গোবিন্দমাণিক্যের প্রবেশ
[ প্রস্থান
রঘুপতির প্রবেশ
পৈতা ছিঁড়িতে উদ্যত
[ প্রস্থান
গোবিন্দমাণিক্যের পুনঃপ্রবেশ
[ প্রস্থানোন্মুখ
পায়ে পড়িয়া
মুখ ঢাকিয়া
[ প্রস্থান
কাঁদিয়া উঠিয়া
পঞ্চম দৃশ্য
মন্দির
একদল লোকের প্রবেশ
কোথায় হে, তোমাদের তিন-শো পাঁঠা, এক-শো-এক মোষ। একটা টিকটিকির ছেঁড়া নেজটুকু পর্যন্ত দেখবার জো নেই। বাজনাবাদ্যি গেল কোথায়, সব যে হাঁ-হাঁ করছে। খরচপত্র করে পুজো দেখতে এলুম, আচ্ছা শাস্তি হয়েছে!
দেখ্, মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে অমন করে বলিস নে। মা পাঁঠা পায় নি, এবার জেগে উঠে তোদের এক-একটাকে ধরে ধরে মুখে পুরবে।
কেন! গেল বছরে বাছারা সব ছিলে কোথায়? আর, সেই ও-বছর, যখন ব্রত সাঙ্গ করে রানীমা পুজো দিয়েছিল, তখন কি তোদের পায়ে কাঁটা ফুটেছিল? তখন একবার দেখে যেতে পার নি? রক্তে যে গোমতী রাঙা হয়ে গিয়েছিল। আর অলুক্ষুনে বেটারা এসেছিস, আর মায়ের খোরাক পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল। তোদের এক-একটাকে ধরে মা’র কাছে নিবেদন করে দিলে মনের খেদ মেটে।
আর ভাই, মিছে রাগ করিস। আমাদের কি আর বলবার মুখ আছে! তা হলে কি আর দাঁড়িয়ে ওর কথা শুনি!
তা যা বলিস ভাই, অপ্পেতেই আমার রাগ হয় সে কথা সত্যি। সেদিন ও ব্যক্তি শালা পর্যন্ত উঠেছিল, তার বেশি যদি একটা কথা বলত, কিম্বা আমার গায়ে হাত দিত, মাইরি বলছি, তা হলে আমি–
তা, চল্-না দেখি, কার হাড়ে কত শক্তি আছে।
তা, আয়-না, জানিস? এখানকার দফাদার আমার মামাতো ভাই হয়!
তা, নিয়ে আয় তোর মামাকে সুদ্ধ নিয়ে আয়, তোর দফাদারের দফা নিকেশ করে দিই।
তোমরা সকলেই শুনলে!
আর দূর কর্ ভাই, ঘরে চল্। আজ আর কিছুতে গা লাগছে না। এখন তোদের তামাশা তুলে রাখ্।
এ কি তামাশা হল? আমার মামাকে নিয়ে তামাশা! আমাদের দফাদারের আপনার বাবাকে নিয়ে–
আর রেখে দে! তোর আপনার বাবা নিয়ে তুই আপনি মর্।
[ সকলের প্রস্থান
রঘুপতি নয়নরায় ও জয়সিংহের প্রবেশ
[ প্রস্থান
[ জয়সিংহ ও রঘুপতির প্রস্থান
পুরবাসীগণের প্রবেশ
গান
জয় মা!
আর ভয় নেই!
ওরে, সেই দক্ষিণদ’র মানুষগুলো এখন গেল কোথায়?
মায়ের ঐশ্বর্য বেটাদের সইল না। তারা ভেগেছে।
কেবল মায়ের ঐশ্বর্য নয়, আমি তাদের এমনি শাসিয়ে দিয়েছি, তারা আর এমুখো হবে না। বুঝলে অক্রূরদা, আমার মামাতো ভাই দফাদারের নাম করবা-মাত্র তাদের মুখ চুন হয়ে গেল।
আমাদের নিতাই সেদিন তাদের খুব কড়া দুটো কথা শুনিয়ে দিয়েছিল। ওই যার সেই ছুঁচ-পারা মুখ সেই বেটা তেড়ে উত্তর দিতে এসেছিল; আমাদের নিতাই বললে, “ওরে, তোরা দক্ষিণদেশে থাকিস, তোরা উত্তরের কী জানিস? উত্তর দিতে এসেছিস, উত্তরের জানিস কী?” শুনে আমরা হেসে কে কার গায়ে পড়ি।
ইদিকে ঐ ভালোমানুষটি, কিন্তু নিতাইয়ের সঙ্গে কথায় আঁটবার জো নেই।
নিতাই আমার পিসে হয়।
শোনো একবার কথা শোনো। নিতাই আবার তোর পিসে হল কবে?
তোমরা আমার সকল কথাই ধরতে আরম্ভ করেছ। আচ্ছা, পিসে নয় তো পিসে নয়। তাতে তোমার সুখটা কী হল? আমার হল না বলে কি তোমারই পিসে হল?
রঘুপতি ও জয়সিংহের প্রবেশ
শুনলুম সৈন্য আসছে। জয়সিংহ অস্ত্র নিয়ে তুমি এইখানে দাঁড়াও। তোরা আয়, তোরা এইখানে দাঁড়া! মন্দিরের দ্বার আগলাতে হবে। আমি তোদের অস্ত্র এনে দিচ্ছি।
অস্ত্র কেন ঠাকুর?
মায়ের পুজো বন্ধ করবার জন্য রাজার সৈন্য আসছে।
সৈন্য আসছে! প্রভু, তবে আমরা প্রণাম হই।
আমরা ক’জনা, সৈন্য এলে কী করতে পারব?
করতে সবই পারি–কিন্তু সৈন্য এলে এখেনে জায়গা হবে কোথায়? লড়াই তো পরের কথা, এখানে দাঁড়াব কোন্খানে?
তোর কথা রেখে দে। দেখছিস নে প্রভু রাগে কাঁপছেন? তা ঠাকুর, অনুমতি করেন তো আমাদের দলবল সমস্ত ডেকে নিয়ে আসি।
সেই ভালো। অমনি আমার মামাতো ভাইকে ডেকে আনি। কিন্তু, আর একটুও বিলম্ব করা উচিত নয়।
[ সকলের প্রস্থানোদ্যম
সরোষে
দাঁড়া তোরা!
করজোড়ে
স্বগত
প্রকাশ্যে
রানীর অনুচর ও পুরবাসীগণের প্রবেশ
[ জয়সিংহের প্রস্থান
বাদ্যোদ্যম
অনুচরের প্রতি
কোথা আছে
সেনাপতি, ডেকে আন্! হায় রঘুপতি,
অবশেষে সৈন্য দিয়ে ঘিরিতে হইল
ধর্ম! লজ্জা হয় ডাকিতে সৈনিকদল,
বাহুবল দুর্বলতা করায় স্মরণ।
নয়নরায় ও চাঁদপালের প্রবেশ
নয়নের প্রতি
[ প্রণামপূর্বক প্রস্থান
জয়সিংহের প্রবেশ
[ রঘুপতি ও জয়সিংহের প্রস্থান
[ প্রস্থান
পরবর্তী পাঠের সুপারিশ
"বিসর্জন (কাব্য-নাটক)" পড়তে পড়তে আপনার পছন্দের অন্যান্য বই
বিসর্জন (কাব্য-নাটক)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর