প্রাচীন আমেরিকার সভ্যতা ও সংস্কৃতি মায়া, আজটেক, ইনকা ও অন্যান্য সভ্যতা
ক্রিস্টফার কলম্বাস যখন পনেরো শতকের শেষভাগে, ১৪৯২ খ্রীষ্টাব্দে, ইউরোপ থেকে আমেরিকা যাওয়ার জলপথ আবিষ্কার করেন, তারপরে ষোল শতকে দলে দলে স্পেনীয়রা সোনা, রূপা ও ধনরত্নের লোভে আমেরিকা মহাদেশে যেতে শুরু করে। স্পেনীয়রা ১৫১৯ খ্রীষ্টাব্দে মধ্য-মেক্সিকো অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছলে সেখানে অনেক সমৃদ্ধ নগর ও রাজ্যের সন্ধান পায়। এ নগরগুলো ছিলো আজটেক সাম্রাজ্যের অধীনে। এ নগরগুলোতে স্পেনীয়রা দালান-কোঠা, বড় বড় প্রাসাদ, পিরামিড, মন্দির, রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার প্রভৃতি দেখতে পায়। এরপরে স্পেনীয় সৈন্যদল যখন গুয়াতেমালা এবং পূর্ব-মেক্সিকো অঞ্চলে যায় তখন সেখানে আজটেক সভ্যতার চেয়েও প্রাচীন এক সভ্যতার সাক্ষাৎ পায়। এ উন্নত সভ্যতার নাম ছিলো মায়া সভ্যতা। মায়া অঞ্চলেও স্পেনীয়রা পাথরের বাড়ি-ঘর, প্রাসাদ, পিরামিড, মন্দির, পথ-ঘাট, হাট-বাজার সমন্বিত অনেক নগরের সাক্ষাৎ পেয়েছিলো।
স্পেনীয় ভাগ্যান্বেষীরা এরপর দক্ষিণ-আমেরিকায় যায় এবং সেখানে পেরু অঞ্চলে আন্দিজ পর্বতের উপরে ইনকা সাম্রাজ্যের সন্ধান লাভ করে। এরপরে স্পেনীয় এবং অন্যান্য ইউরোপীয়রা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাতে ধনসম্পদের লোভে আরো অনেককাল নতুন নতুন রাজ্যের সন্ধান করেছে কিন্তু নতুন কোনো রাজ্য বা নগর সভ্যতার সন্ধান তারা পায় নি। শুধু মেক্সিকো-গুয়াতেমালা অঞ্চলে এবং ইকুয়েডর-পেরু-বলিভিয়া অঞ্চলেই উন্নত সভ্যতার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিলো। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বাকি অংশে ছিলো শিকারী মানুষ অথবা সামান্য কিছু কৃষিজীবী মানুষ।
ক্রমে ক্রমে প্রাচীন আমেরিকার সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার ইতিহাসের সামগ্রিক চিত্রটা পাওয়া গেছে। জানা গেছে, আজ থেকে ৩০ বা ৪০ হাজার বছর আগে শিকারী যুগের পশু শিকারী মানুষ বেরিং প্রণালী পার হয়ে এশিয়া থেকে উত্তর আমেরিকার আলাস্কা অঞ্চলে গিয়েছিলো। তখন পৃথিবীতে বরফ যুগ চলছিলো বলে বেরিং প্রণালী ছিলো বরফে ঢাকা, তাই এ পথে আমেরিকা যেতে শিকারী মানুষের কোনো অসুবিধা হয়নি। উত্তর আমেরিকার আলাস্কা থেকে শিকারী মানুষেরা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিলো। এ মানুষেরা দীর্ঘকাল পর্যন্ত শিকারী সমাজের স্তরেই রয়ে গিয়েছিলো।
কলম্বাস যখন আমেরিকায় গিয়ে পৌঁছে ছিলেন তখন যদি সারা আমেরিকাতে শুধু আদিবাসী শিকারী রেড ইন্ডিয়ানরাই থাকতো তাতে অবাক হওয়ার কিছু ছিলো না। কিন্তু দেখা গেলো, উত্তর আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকার পেরু অঞ্চল পর্যন্ত এলাকার মানুষেরা কৃষিকাজ জানে। আরও দেখা গেলো মেক্সিকো এবং পেরু অঞ্চলে মায়া, আজটেক, ইনকা প্রভৃতি উন্নত সভ্যতারও আবির্ভাব ঘটেছিলো। এর ফলে পণ্ডিতদের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো পণ্ডিত বলেন যে মায়া, আজটেক, ইনকা সভ্যতার সাথে প্রাচীন মিশর, ব্যবিলন ও আসিরিয়ার সভ্যতার মিল আছে, সুতরাং পুরনো পৃথিবী এ সকল প্রাচীন সভ্যতার প্রভাবেই আমেরিকার প্রাচীন সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো। অন্য একদল পণ্ডিত বলেন যে প্রাচীন আমেরিকাতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে ও নিজস্ব পদ্ধতিতে নগর সভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছিলো। এ বিতর্কের মীমাংসা এখন পর্যন্ত হয়নি।
প্রাচীন আমেরিকাতে উন্নত সভ্যতা বলতে যে শুধুমাত্র মায়া, আজটেক ও ইনকা সভ্যতাই গড়ে উঠেছিলো তা নয়। বস্তুত পূর্ববর্তী অন্যান্য সভ্যতার ভিত্তির উপরেই এ তিনটি সভ্যতার উদয় ঘটেছিলো। যেমন, ভেরাক্রুজ-এর দক্ষিণের অঞ্চলে মায়াদের আগে ওলামক সভ্যতার উদয় ঘটেছিলো। মধ্য মেক্সিকোতে আজটেক অঞ্চলে আজটেকদের আগে টোলটেক সভ্যতা এবং তারও আগে টেওটি হুয়াকান-এর সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো। দক্ষিণ-আমেরিকায় আন্দিজ পর্বত অঞ্চলে ইনকাদের আগে চিমু সাম্রাজ্য এবং তার আগে টিয়াহুয়ানাকো, চাভিন ও অন্যান্য সভ্যতা-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিলো। পরবর্তী পৃষ্ঠার তালিকায় এ সকল সভ্যতার কালপঞ্জি দেয়া হলো। তবে এগুলোর মধ্যে একটা সভ্যতার প্রভাব অন্য একটা সভ্যতার উপর পড়েছিলো কি না বা কতখানি পড়েছিলো তার ইতিহাস এখনও সম্পূর্ণ উদ্ঘাটিত হয়নি।
প্রাচীন আমেরিকার বিভিন্ন সভ্যতার কালপঞ্জি
প্রাচীন আমেরিকার কয়েকটি উন্নত সভ্যতার বিবরণ বর্তমান গ্রন্থটির আলোচনার বিষয়রূপে লেখা হয়েছে। স্পেনীয়রা যখন ষোল শতকে নতুন পৃথিবী তথা আমেরিকা মহাদেশে উপনিবেশ বিস্তারের চেষ্টা করে তখন তারা সেখানে মায়া, আজটেক ও ইনকা সভ্যতাকে জীবন্ত সভ্যতা হিসেবে দেখতে পেয়েছিলো। এ কারণে এ তিনটি সভ্যতা সারা পৃথিবীর লোকের কাছে পরিচিত হয়েছে। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যেও মায়া, আজটেক ও ইনকা সভ্যতা সম্পর্কে গভীর আগ্রহ রয়েছে। এ তিনটি সভ্যতার ইতিহাস ও সামগ্রিক পরিচয় সংক্ষেপে এ গ্রন্থে সন্নিবেশিত হলো।
পরবর্তী পাঠের সুপারিশ
"মায়া, আজটেক ও ইনকা সভ্যতা" পড়তে পড়তে আপনার পছন্দের অন্যান্য বই
মায়া, আজটেক ও ইনকা সভ্যতা
আবদুল হালিম